এক সময় ভৈরব নদের কূলে গড়ে ওঠা খুলনার শিল্পাঞ্চল ছিল কর্মচাঞ্চল্য ও অর্থনৈতিক গতিশীলতার প্রতীক। পাটকল, হার্ডবোর্ড মিল ও উপমহাদেশের একমাত্র কাগজ কারখানাকে কেন্দ্র করে খালিশপুর, দৌলতপুর ও আটরা-গিলাতলায় দিন-রাত জমজমাট ছিল শ্রম ও বাণিজ্য। তবে বিংশ শতাব্দীর শুরু থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত একে একে এসব শিল্পপ্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সেই কর্মমুখর অঞ্চল আজ কার্যত স্থবির। এই প্রেক্ষাপটে বিএনপি’র চেয়ারম্যান তারেক রহমানের খুলনা সফরকে ঘিরে নতুন করে আশার সঞ্চার হয়েছে শ্রমিক, ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষের মধ্যে।
খুলনা নিউজপ্রিন্ট মিল ও হার্ডবোর্ড মিল বন্ধ হয় অনেক আগেই। সর্বশেষ ২০২০ সালের ২ জুলাই একযোগে বন্ধ করে দেওয়া হয় সরকারি সব পাটকল। ফলে হাজার হাজার শ্রমিক কর্মহীন হয়ে পড়ে এবং একসময়ের প্রাণবন্ত শিল্পাঞ্চল ধীরে ধীরে পরিণত হয় প্রায় মৃত নগরীতে। তবুও স্থানীয়দের প্রত্যাশা, সঠিক পরিকল্পনা ও রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকলে আবারও এই অঞ্চল কর্মমুখর হয়ে উঠতে পারে।
বিএনপি’র শীর্ষ নেতাদের ভাষ্য অনুযায়ী, খুলনার দীর্ঘদিনের অবহেলা ও বঞ্চনার বিষয়গুলো ইতোমধ্যে তারেক রহমানকে অবহিত করা হয়েছে। দক্ষিণাঞ্চলের সার্বিক উন্নয়নকে অগ্রাধিকার দিয়ে তিনি আসন্ন জনসভায় একটি সুস্পষ্ট ও সময়োপযোগী উন্নয়ন রূপরেখা তুলে ধরবেন বলে আশা করা হচ্ছে। তার বক্তব্যে সুন্দরবনকেন্দ্রিক পর্যটন শিল্পের বিকাশ, উপকূলীয় অঞ্চলে টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণ, বন্ধ মিল-কারখানা পুনরায় চালু, খুলনায় গ্যাস সংযোগ নিশ্চিতকরণ এবং নতুন ইকোনমিক জোন স্থাপনের মতো বিষয়গুলো গুরুত্ব পাবে বলে জানানো হয়। এসব কারণেই তার সফর খুলনাবাসীর কাছে ভিন্ন মাত্রা পেয়েছে।
রোববার দুপুরে খুলনার একটি অভিজাত হোটেলে আয়োজিত প্রেস ব্রিফিংয়ে বিএনপি নেতারা সফরের গুরুত্ব তুলে ধরেন। সেখানে বিএনপি জাতীয় নির্বাহী কমিটির ছাত্র বিষয়ক সম্পাদক ও খুলনা-৩ আসনের প্রার্থী রকিবুল ইসলাম বকুল বলেন, খুলনাঞ্চলে ২৬টি পাটকলসহ হার্ডবোর্ড ও নিউজপ্রিন্ট মিল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় হাজার হাজার মানুষ কর্মহীন হয়েছে। শিল্পকারখানা ধ্বংস করে খুলনাকে পরিকল্পিতভাবে মৃত নগরীতে পরিণত করা হয়েছে। শ্রমিকদের স্বপ্ন আবারও এই অঞ্চলকে কর্মমুখর শিল্পনগরীতে রূপ দেওয়া। তিনি বলেন, উপকূলীয় এলাকায় টেকসই বেড়িবাঁধ না থাকায় প্রতিবছর মানুষ প্রাকৃতিক দুর্যোগের মুখে পড়ছে। তারেক রহমানের জনসভা থেকেই এই বঞ্চনার অবসানের সূচনা হবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
প্রেস ব্রিফিংয়ে বিএনপি’র জাতীয় নির্বাহী কমিটির তথ্য বিষয়ক সম্পাদক ও খুলনা-৪ আসনের প্রার্থী আজিজুল বারী হেলাল বলেন, খুলনাঞ্চলের মানুষের জীবনমান উন্নয়নে কর্মসংস্থান সৃষ্টি, পরিকল্পিত শিল্পায়ন ও আধুনিক অবকাঠামো উন্নয়নের বিকল্প নেই। তারেক রহমান ঘোষিত উন্নয়ন রূপরেখা বাস্তবায়িত হলে দক্ষিণাঞ্চল অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হয়ে উঠবে। খুলনায় ইকোনমিক জোন এবং সুন্দরবনকেন্দ্রিক পর্যটন শিল্প গড়ে উঠলে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ বাড়বে এবং জাতীয় অর্থনীতিতে এই অঞ্চলের গুরুত্ব বহুগুণে বৃদ্ধি পাবে।
খুলনা মহানগর বিএনপি’র সাবেক সভাপতি ও খুলনা-২ আসনের প্রার্থী নজরুল ইসলাম মঞ্জু বলেন, খুলনার শিল্পায়নের প্রধান অন্তরায় হলো গ্যাসের অভাব। গ্যাস সংযোগ নিশ্চিত করা গেলে নতুন শিল্প স্থাপন সহজ হবে। তিনি জানান, খালিশপুর প্রভাতী স্কুল মাঠের জনসভা কেবল একটি নির্বাচনী সমাবেশ নয়; বরং খুলনাসহ দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্ধারণে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হয়ে উঠতে পারে।
সব মিলিয়ে, দীর্ঘদিনের স্থবিরতা কাটিয়ে খুলনাকে আবারও কর্মমুখর শিল্পনগরীতে রূপ দেওয়ার প্রত্যাশা ঘিরেই তারেক রহমানের সফরের দিকে তাকিয়ে আছে দক্ষিণাঞ্চলের মানুষ।

0 Comments